Home / স্বাস্থ্য / ঢাকা-চট্টগ্রামে তুলকালাম কাণ্ড সত্ত্বেও বিভিন্ন স্থানে বিশ্ব ডিম দিবস পালিত

ঢাকা-চট্টগ্রামে তুলকালাম কাণ্ড সত্ত্বেও বিভিন্ন স্থানে বিশ্ব ডিম দিবস পালিত

ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ডিম সস্তায় বিক্রি এবং বিনামূল্যে খাওয়ানোর ঘোষণা দিয়ে লাঠিপেটায় সাঙ্গ হয়েছে এ কর্মসূচি! ঢাকায় মাত্র ৩ এবং চট্টগ্রামে মাত্র ৪ টাকায় ডিম বিক্রির প্রচারণায় অভূতপূর্ব সাড়া মেলায় দেশের এ প্রধান দু’ শহরে এ নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে!

ফেসবুকে এবং জাতীয় নানা পত্র-পত্রিকায় গতকাল ‘সকাল ১০টা থেকে ৩ টাকা দরে ডিম বিক্রি হবে এবং প্রত্যেকে সর্বোচ্চ ৯০টি ডিম কিনতে পারবে’ জেনে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা নানা পেশার ও বয়সের লোক রাজধানীর খামারবাড়ীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে জড়ো হতে থাকলে, সকাল ৮টার মাঝেই তা জনসমুদ্রে রূপ নেয়! ৯টার দিকে ক্রেতাদের লাইন বিজয় সরণি পার হয়ে যায়! কারো হাতে বালতি, কারো হাতে খাঁচি, কারো হাতে ঝুড়ি এবং কারো হাতে ছিলো কার্টন। অব্যবস্থাপনায় ভিড়ের চাপে বিশৃঙ্খলা শুরু হলে, স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে হয় হাতাহাতি। অগত্যা পুলিশকে লাঠিপেটা করতে হয়। ফলে, বিক্ষোভ হতে থাকে! সকাল ১০টার আগেই পণ্ড হয়ে যায় সস্তায় ডিম বিক্রির প্রচারাভিযান। ধাক্কাধাক্কিতে মিলনায়তনের বাইরের জায়গায় ডিম বিক্রির প্যাণ্ডেলগুলোও ভেঙে যায়। আরও ভাঙে কাউন্টারে রাখা কয়েক হাজার ডিম!

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সদস্য বিশ্বজিৎ রায় জানান, ভর্তুকি মূল্যে বিক্রির জন্যে এক লাখ ডিম এনেছিলেন তারা। সকাল ১০টায় বিক্রি শুরুর কথা থাকলেও ভিড় দেখে ৯টার দিকেই বিক্রি শুরু হয়। কিন্তু এতো মানুষের চাপে আধা ঘণ্টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এতে করে ১০টা বাজার আগেই ডিম বিক্রি বন্ধ ঘোষণা করতে হয়। মানুষ যে এতো অভূতপূর্ব সাড়া দেবে, তা আমরা ভাবতেও পারিনি। ফলে, যা হওয়ার তাই হয়েছে। আমরা দুঃখিত।

জানা যায়, ৫ বছর ধরেই ডিম দিবসে মানুষকে উৎসাহিত করতে নানাভাবে প্রচার চালিয়ে আসছিলো বিপিআইসিসি। কিন্তু সেসব র‍্যালী বা আলোচনা সভায় দু’শ’ লোকও হতো না। এবার ৩ টাকায় ডিম বিক্রির আয়োজন করে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়ার পাশাপাশি ফেসবুকেও প্রচার চালানো হয় – যা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিতও হয়। সব মিলিয়ে আয়োজকরা এবার প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি প্রচার পেয়ে যান। একজন কর্মকর্তা বলেন: খামারবাড়িতে টিসিবির ট্রাক থেকে প্রতিদিনই নিত্যপণ্য বিক্রি হয়। সেখানে যারা নিয়মিত কিনতে আসেন, তাদের সঙ্গে আরও কিছু বেশি ক্রেতা ডিম কিনতে আসতে পারেন বলে ভেবেছিলেন আমরা। কিন্তু সকালে এতো মানুষ দেখে আমরা হতভম্ব! ডিম দিতে পারিনি ঠিকই; তবে ডিমের প্রচার হয়েছে।

গাজীপুর থেকে আসা একজন ক্রেতা বলেন: মানুষের সঙ্গে তামাশা করা হচ্ছে। কাউকে তো ডিম কিনে নিয়ে যেতে দেখলাম না। তাহলে, এতো ডিম গেল কোথায়? পুরো ব্যাপারটা একটা ধোঁকাবাজি। তারা মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।

চট্টগ্রামে সকাল ১১টা থেকে মাত্র ২০ মিনিটে বিক্রি হয়ে যায় ২৫ হাজার ডিম! বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষ্যে গতকাল চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব, আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ ও জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদের সামনে বেলা ১১টা থেকে ৪ টাকায় ডিম বিক্রির ঘোষণা দেন পরশু জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ রেয়াজুল হক।। এছাড়া, তিনি প্রেসক্লাবের সামনে এক হাজার সিদ্ধ ডিম বিনামূল্যে খাওয়ানোর কথাও জানান। ফলে, ঐ ৩ জায়গায় ক্রেতাদের ঢল নামে। ২০ মিনিট হতেই সহসা ঘোষণা হয়: সব ডিম শেষ! এরপর আয়োজকরা দ্রুত গাড়ি নিয়ে কেটে পড়েন। তখনও দু’ পাশে শতাধিক লোক ডিম কিনতে লাইনে দাঁড়িয়ে। অনেক ক্রেতাকে গাড়ির পেছন পেছন দৌঁড়াতেও দেখা গেছে। অধিকাংশ ক্রেতাই খালি হাতে ফেরেন। তাদের দাবি: ‘মোটেও অতো ডিম বিক্রি করেনি প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর। তারা ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। ২০ মিনিটে কিভাবে এতো ডিম বিক্রি সম্ভব?

যাহোক, গতকাল সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালী শুরু হয়ে মৎস্য ভবন প্রদক্ষিণ করে আবার প্রেসক্লাবে এসে শেষ হয়। এতে মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ অধিদফতরের কর্মকর্তা ও পোল্ট্রি ব্যবসায়ীরা অংশ নেন। ডিম খাওয়ার প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে তারা নানা শ্লোগান দেন। পরে প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

বক্তারা বলেন: বাংলাদেশে ডিমের চাহিদা পূরণে খামারিদের আরও মনোযোগী হতে হবে। সে সঙ্গে সরকারকে খামারিদের সমস্যা সমাধানে এবং ভর্তুকি দিয়ে পোল্ট্রি শিল্প এগিয়ে নিতে হবে। একটি সুখী সমৃদ্ধশালী ও স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনে ডিমের কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশের মানুষ বছরে ডিম খায় গড়ে ৫১টি। আর বাংলাদেশ লাইভ স্টক সোসাইটি বলছে, দেশের মানুষ বছরে ডিম খায় গড়ে মাত্র ৪৫ থেকে ৫০টি। অথচ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, সুস্থ্য থাকতে জনপ্রতি ডিম খাওয়া দরকার অন্তত ১০৪টি; অর্থাৎ দেশের মানুষের আরও ডিম খাওয়া উচিৎ।

পোল্ট্রি সংশ্লিষ্ট ৭টি অ্যাসোসিয়েশনের সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ড্রাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) এবং মৎস ও প্রাণী সম্পদ অধিদফতর যৌথভাবে দিবসটি উদযাপন করে। প্রতি বছর অক্টোবরের দ্বিতীয় শুক্রবার পালিত হয় বিশ্ব ডিম দিবস। ২০ বছর ধরে দিবসটি ৬০টি দেশে পালিত হয়ে আসছে। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশনের (আইইসি) উদ্যোগে ঐ বছর থেকেই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। রাজশাহী, সিলেট, জামালপুর ও কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানেও দিবসটি পালিত হয়।

রাজশাহীতে প্রথমবারের মতো দিবসটি পালিত হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে একটি র‍্যালী শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে এবং মহানগরীর আলুপট্টিসহ বিভিন্ন পয়েন্টে বিনামূল্যে ডিম বিতরণ করে। এরপর অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন: সব বয়সের মানুষের জন্যে ডিম একটি উত্তম খাদ্য। ডিম চোখের জ্যোতি বাড়ায় এবং অন্ধত্ব প্রতিরোধ করে। লিউটিন ও জিয়াজানথিন বার্ধক্যজনিত ক্ষয়রোধ করে। ক্যারোলিন হার্টের রোগ প্রতিরোধেও ডিম কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ডিম নিয়ে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই।

সিলেটে সকাল সাড়ে ৯টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে একটি র‍্যালী বের হয়ে নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে ১০টায় জেলা পরিষদের মিলনায়তনে এসে শেষ হয়। সেখানে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোঃ জয়নাল আবেদীন বলেন: ‘ডিমের পুষ্টিগুণ অনেক। প্রতিদিনের খাবারের সাথে ডিম খুবই গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য। সুস্থ্য থাকার জন্যে প্রতিদিন ডিম খাওয়ার বিকল্প নেই। ব্রয়লার ও লেয়ার ১দিন বয়সের বাচ্চা সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করলে, আমাদের খামারিরা উৎসাহিত হবে। এতে করে ডিমের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং ডিমের মূল্যও মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে।’ এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক থাকার আহবান জানান তিনি।

জামালপুর জেলা শহরের বকুলতলা চত্বর থেকে দুপুরে একটি র‍্যালী বের করা হয়। পরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। তাতে সুস্থ থাকতে প্রতিদিন ডিম খাদ্য তালিকায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা মাল্টিমিডিয়ায় উপস্থাপন করা হয়।

কুমিল্লার চান্দিনায় সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চান্দিনা-বাগুর বাস স্টেশন এলাকায় মার্স ফিডের আয়োজনে র‌্যালি ও ডিমের উপকারিতা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষে পথচারীদের মাঝে বিনা মূল্যে ডিম বিতরণ করা হয়।

জানা গেছে, বিশ্বব্যাপী ডিমের চাহিদা প্রতি বছরই বাড়ছে। গত ৪১ বছরে বিশ্বে ডিম খাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে তিন গুণ। এগ কমিশন বলছে, ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাপী ডিমের চাহিদা মেটাতে প্রায় ৮ কোটি টন ডিমের দরকার হবে। প্রাণী সম্পদ অধিদফতরের তথ্য মোতাবেক, দেশে ২০১৪-১৫ অর্থ-বছরে ১ হাজার ৯৯ কোটি ৬১ লাখ ৬৭ হাজার ৬ শ’ ৩৮টি ডিম উৎপাদিত হয়েছে। এতে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা (১ হাজার ৯৫ কোটি ডিম) ছাড়ালেও তা দিয়ে দেশের চাহিদার মাত্র ৬৮% পূরণ হচ্ছে। র‌্যালি ও আলোচনা সভায় পোল্ট্রি খাতের ব্যবসায়ী ও মৎস্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

About superadmin

Check Also

বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস আজ

সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মোর্চা ‘পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ ফর হ্যান্ডওয়াশিং’ ২০০৮ সালের ১৫ ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *