Breaking News
Home / আন্তর্জাতিক / বিরোধী দমনে মিসরের সেকুলার সিসি সরকারের গুমের লোমহর্ষক কাহিনী

বিরোধী দমনে মিসরের সেকুলার সিসি সরকারের গুমের লোমহর্ষক কাহিনী

মিসরের একটি মানবাধিকার সংগঠন বলেছে, সে দেশে গত চার বছরে অন্তত দেড় হাজার লোক নিখোঁজ হয়েছে বলে তাদের কাছে দলিলপত্র আছে। কিন্তু আসল সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

মানবাধিকার-কর্মী মোহাম্মদে লফতির ভাষায়, রাষ্ট্রপতি আবদুল ফাত্তাহ আল সিসির শাসনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব রহস্যজনক অন্তর্ধান।

সরকারের বিরোধী বা বিরোধী বলে সন্দেহভাজন যে কেউ এখন ঝুঁকির মুখে; সে সন্দেহ ঠিক হোক বা না হোক তাতে কিছু এসে যায় না। সন্দেহভাজনদের আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুরাও কখনও কখনও গ্রেফতার হতে পারেন। এসব আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু অনেক ইসলামপন্থী।

মানবাধিকার-কর্মীরা বলেন, এসব নিখোঁজ যখন কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর আবার আবির্ভূত হন, তার আগে তাদের ওপর অত্যাচার করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে আনা হয় সন্ত্রাসের অভিযোগ।

কায়রোর হাসপাতালে মানসিক বিপর্যয়ের কারণে চিকিৎসাধীন ছিলেন ২৩ বছরের জুবেইদা। তার ছোট ভাই তাকে হাসপাতাল থেকে তুলে নিয়ে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যেতে রওনা হলেন। পথে একটা ওষুধের দোকান পড়লো। জুবেইদাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে তার জন্য ওষুধ কিনতে ঢুকলেন তার ভাই। কয়েক মিনিট পর তার ভাই বেরিয়ে এসে দেখলেন জুবেইদা নেই। সেদিন ছিলো ৮ই এপ্রিল ২০১৭। জুবেইদাকে আর কখনও দেখা যায়নি। মিসরের অসংখ্য নিখোঁজদের তালিকায় উঠে গেছেন তিনি।

অশ্রুসজল চোখে তার মা বলেন: গত ১০ মাস ধরে আমরা জুবেইদাকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছি। আমরা জানি পুলিশই তাকে নিয়ে গেছে। আমাদের প্রতিবেশীরা বলেছে, মুখোশ পরা অস্ত্রধারী লোকেরা পুলিশের গাড়িতে করে এসে তাকে তুলে নিয়ে গেছে। তারা আমাদের পুরনো বাড়িতেও গিয়েছিলো আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে।

জুবেইদার হাতে ছিল তার ভাইয়ের মোবাইল ফোনটি। তিনি আটক হওয়ার পর একটা ফোন করতে পেরেছিলেন একজন আত্মীয়কে। সে শুনতে পেয়েছে একজন অফিসার জুবেইদাকে গালাগাল করছে। এর পরই ফোনটা বন্ধ করে দেয়া হলো।

আসলে ঘটনার শুরু তারও কয়েক বছর আগে। ২০১৪ সালে জুবেইদা এবং তার মা একটি নিষিদ্ধ সমাবেশে যোগ দেয়ার অপরাধে সাত মাসের জেল খেটেছিলেন। তবে পরে তাদের খালাস দেয়া হয়েছিলো।

নিজের নাম প্রকাশ না করে জুবেইদার মা বলছিলেন: পুলিশ আমাদের ধরে নিয়ে ১৪ ঘণ্টা ধরে মারধর করে; গালাগাল করে। আমাদের কাপড় খুলে ফেলে বিদ্যুতের শক দেয়। তারা আমাদের স্বীকার করতে বলে যে, আমরা একটা হোটেলে বোমা ফাটাতে পরিকল্পনা করেছি; আমাদের কাছে অস্ত্র আছে; এসব মিথ্যা অভিযোগ। আমি শুনতে পাচ্ছিলাম জুবেইদার চিৎকার; কিন্তু তাকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। ওরা হুমকি দিলো – অভিযোগ স্বীকার না করলে, আমার সামনেই জুবেইদাকে ধর্ষণ করবে। তবুও আমরা স্বীকার করিনি। আমরা কখনও মুসলিম ব্রাদারহুড বা অন্য কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন করেননি।

ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মোরসি রাষ্ট্রপতি হওয়ার এক বছরের ভেতরেই ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর ২০১৩ সালে ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

সাত মাস জেলে থাকার পর তারা কারগার থেকে ছাড়া পেলেন। তার বছর দুয়েক পরই ২০১৬ সালের জুলাই মাসে প্রথমবারের মতো জুবেইদা নিখোঁজ হন। তার মায়ের কথা, সেবারও পুলিশই তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। এর ২৮ দিন পর জুবেইদাকে পাওয়া যায় শহরের উপকণ্ঠে – সেখানে পুলিশ তাকে হাত-পা এবং চোখ বাঁধা অবস্থায় রাস্তার পাশে ফেলে রেখে গিয়েছিলো।

জুবেইদার মা বলেন: তার গায়ে ছিল কাটা দাগ, বিদ্যুতের শক দেয়ার দাগ। আল্লাহ্ যাতে ক্রুদ্ধ হন, এ রকম সব অত্যাচারই তার ওপর করেছে তারা। সব কিছু।

এরপর জুবেইদার মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। তাকে হাসপাতালে মানসিক চিকিৎসা দিতে হয়। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বেরোনোর পরই আবার তাকে অপহরণ করা হয় এবং তিনি আর ফেরেননি।

ইব্রাহিম মেতওয়ালির কাহিনী

গত বছর ১০ই সেপ্টেম্বর ৫২ বছর বয়স্ক আইনজীবী ইব্রাহিম মেতওয়ালি সুইজারল্যান্ডে যেতে রওনা দিলেন কায়রো বিমানবন্দরের দিকে। তিনি যাচ্ছিলেন জাতিসংঘের একটি ওয়ার্কিং গ্রুপের সামনে মিসরের এসব রহস্যময় অন্তর্ধানগুলোর বিষয়ে জবানবন্দি দিতে।

মেতওয়ালির বড় ছেলে আমর চার বছর ধরে নিখোঁজ। তার ছোট ছেলে আবদেল মোনিইম বলছিলেন: আমার মা বাবাকে বলেছিলেন দেশের বাইরে না যেতে। কিন্তু তিনি শোনেননি। ঐদিন মেতওয়ালির ফোন থেকে তার পরিবার একটি টেক্সট পেলেন যে, তিনি জেনেভার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। কিন্তু আসলে ইব্রাহিম সেই বার্তা পাঠাননি। তিনি ততোক্ষণে নিখোঁজদের খাতায় নাম লিখিয়েছেন।

ঘটনাটা বিদেশের সংবাদমাধ্যমে খবর হলো। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে দু’দিন পর তাকে আদালতে হাজির করা হলো। তাকে মিথ্যা খবর ছড়ানো এবং অবৈধ সংগঠন তৈরির দায়ে অভিযুক্ত করা হলো।

মেতওয়ালি জেনেভা যেতে পারলে যেসব ঘটনার কথা বলতেন, তাতে হয়তো ইতালিয়ান ছাত্র গিউলিও রেগেনির ঘটনাটা থাকতো।

২০১৬ সালের জানুয়ারিতে রেগেনি কায়রো থেকে নিখোঁজ হন। এরপর তার ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায় শহরের উপকণ্ঠে – যেখানে জুবেইদাকে পাওয়া গিয়েছিলো – তার কাছেই।

মেতওয়ালির ছেলে আমরকে এখনও মুক্তিও দেয়া হয়নি, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও আনা হয়নি।

মানবাধিকার-কর্মীদের অনেকে বলেন, আবদুল ফাত্তাহ আল সিসির শাসনের মতো এতো রক্তাক্ত সময় তারা আগে কখনও দেখেননি।

তাদের একজন মোনা সইফের কথা: জীবনকে এতো কম মূল্য দেয়, এমন প্রশাসন আমরা আর দেখিনি।

বিবিসির সংবাদদাতা অরলা গুয়েরিন লিখছেন: ২০১১ সালের তাহরির স্কোয়ার অভ্যুত্থানের পর অনেক তরুণ কর্মী অনেক সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখতেন। এখন তারা শুধু কোনো মতে টিকে আছেন; দিনগুলো পার করে দিচ্ছেন। তাদের কথা- মিসরের ভেতরে এখন কোনো লড়াই করার স্পৃহা নেই। তারা এখন ভীত। কায়রোতে ২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থানের কেন্দ্রবিন্দু তাহরির স্কোয়ার এখন পর্যটকদের সেলফি তোলার জায়গায় পরিণত হয়েছে। মিসরে এখন মৃত্যুদণ্ড, গুম ও নির্যাতন প্রতিদিনের খবর হয়ে গেছে। যারা আগে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলেও এখন নীরব হয়ে গেছেন – তারাও এখনও আটক হচ্ছেন।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এখন আক্রান্ত। মিসর হচ্ছে সাংবাদিকদের জেলে পাঠানোর ক্ষেত্রে পৃথিবীতে তৃতীয় স্থানে।

২৮শে মার্চ মিসরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এতে যারা আল সিসির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন, তারা অযোগ্য ঘোষিত হয়েছেন। কেউ আটক হয়েছেন। কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। অবশ্য একজন প্রতিদ্বন্দ্বী আছেন। তিনি মধ্যপন্থী মুসা মুস্তাফা মুসা। তাকে সাজানো প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হলেও তিনি তা অস্বীকার করেন।

অনেকে বলেছেন, এ নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি সিসির সঙ্গে তার ছায়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। সিসির সময় মিসরে ১৭টি নতুন কারাগার নির্মিত হয়েছে। রাজনৈতিক বন্দির সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার – বলেছেন মানবাধিকার-কর্মীরা।

রাষ্ট্রপতি সিসি অক্টোবরে বলেছেন: মানবাধিকারের ব্যাপারে বলতে গেলে বলতে হয়, এটি ইউরোপ নয়। এটি অন্য জায়গা।

তার কথা, মানবাধিকার গ্রুপগুলোর তথ্য বিশ্বাসযোগ্য নয়।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনেকে সিসির মানবাধিকার রেকর্ড দেখেও না দেখার ভান করে। কারণ, তিনি উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে একজন মূল্যবান মিত্র। বিবিসি বাংলা।

About superadmin

Check Also

তুরস্ক এস-৪০০ কিনলে ন্যাটো ঝুঁকিতে পড়বে: মার্কিন জেনারেল

তুর্কি সরকার রাশিয়ার কাছ থেকে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এস-৪০০ কেনার যে পরিকল্পনা করেছে, তা ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *