Home / অপরাধ / শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফের সাজা মওকুফ, গোপনে কারামুক্তি এবং দেশত্যাগের নেপথ্যে

শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফের সাজা মওকুফ, গোপনে কারামুক্তি এবং দেশত্যাগের নেপথ্যে

রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন হিসেবে পরিচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ জোসেফ অত্যন্ত গোপনে কারামুক্ত হয়েছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মুক্তির আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও কর্তাব্যক্তিদের বিষয়টি অবহিত করা হয়। কিন্তু জোসেফের বেলায় তা অনুসরণ করা হয়নি বলে জানা গেছে।

২০১২ সালের ১৪ই ডিসেম্বর প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি জেল থেকে গোপনে ছাড়া পায় রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডের আরেক ডন বিকাশ কুমার বিশ্বাস। অত্যন্ত গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায় সে। শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফের বেলায়ও একই ঘটনা ঘটেছে। যাবজ্জীবন দন্ডপ্রাপ্ত এ আসামির সাজা মওকুফ হওয়ার পর গত রবিবার রাতে তাকে মুক্তি দেয়া হয় বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন জোসেফ। সেখান থেকেই মুক্তি পায় ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের এ অন্যতম নিয়ন্ত্রক। যেদিন মুক্ত হয় – সেদিন রাতেই সে দেশত্যাগ করে বলে জানা গেছে। ঘনিষ্ঠ সূত্রমতে, সে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাবে এবং সেখানেই স্থায়ী হবে। এ লক্ষ্যে তার প্রাথমিক গন্তব্য ভারত।

১৯৯৬ সালের ৭ই মে মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ায় ফ্রিডম পার্টির নেতা ও ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানকে গুলি করে হত্যার দায়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ জোসেফকে ১৯৯৯ সালে মৃত্যুদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। এ রায়ের বিরুদ্ধে জোসেফ আপিল করলেও মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। পরে আপিল বিভাগ এ সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।এখনো সেই সাজা ভোগ করা বাকি আছে প্রায় ২০ বছর। তার সম্ভাব্য মুক্তির তারিখ ছিলো ২০৩৯ সালের ২৪শে জানুয়ারি।

কারা সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে জোসেফের মা রেনুজা বেগম তার সন্তানের সাজা মওকুফে আবেদন করেন। ধারণা করা হচ্ছে, সাজা মওকুফের আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পর আনুষঙ্গিক কাজ অত্যন্ত গোপনে সেরে মুক্তি পায় সে। এরও আগে অন্যান্য মামলায় আদালত তাকে জামিন দেন

জোসেফের মুক্তির বিষয়টি খুবই গোপনীয়তার সঙ্গে করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনেকেই বিষয়টি জানেন না। তবে অপরাধ জগতে তথ্যটি ছড়িয়ে গেছে। ২০ বছর আগে জোসেফকে যখন গ্রেপ্তার করা হয়, তখন তার নামে ঢাকার বিভিন্ন থানায় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, খুন, অবৈধ অস্ত্র বহনসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ১১টি মামলা হয়। কেবল একটি মামলা ছাড়া সবগুলোরই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে অনেক আগে।

কারাগারে বন্দি জোসেফ চিকিৎসার জন্য ২০ মাস ধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের (বিএসএমএমইউ) কারাকক্ষে ছিলেন। জোসেফ অসুস্থ না হয়েও দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসার নামে আরাম-আয়েশ করছেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে গত ৭ই মে তাকে কারাগারে ফিরিয়ে নেয় কারা কর্তৃপক্ষ।

এরপর বুধবার রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার পরিপ্রেক্ষিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নিয়ে কারাবন্দি শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ জোসেফকে শারীরিক অসুস্থতার জন্য বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়।

বুধবার সচিবালয়ের নিজ দফতরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এ তথ্য জানান। শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ দেশ ছাড়ার প্রসঙ্গে স্বারাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন: দেখুন, জোসেফের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল এবং সে অলরেডি ২০ বছর কারাভোগ করেছেন। তিনি ২০ বছর কারাভোগের পরে ডিউ প্রোসেসে আবেদন করেছেন। সেই আবেদনটি মহামান্য রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত যাচ্ছে।

জোসেফ ইন্ডিয়াতে চলে গেছেন সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে জানতে চাইলে সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে মন্ত্রী বলেন: ইন্ডিয়াতে চলে গেছেন আপনি দেখেছেন নাকি? আমার দেখে (নথিপত্রাদি) বলতে হবে। না দেখে বলতে পারবো না।

তা হলে কি আপনার কাছে কোনো তথ্য নেই? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন: জী। তিনি আবেদন করেছিলেন ভয়ানক অসুস্থ্। তাকে বাকী এক বছর তিন মাস সাজা মাফের জন্য মার্সি পিটিশন করেছিলেন। সেই মার্সি পিটিশন খুব সম্ভব মহামান্য রাষ্ট্রপতি অনুমোদন করেছেন। জোসেফের কিছু অর্থদণ্ড ছিলো। সেগুলো আদায় সাপেক্ষে তাকে বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করানোর অনুমতি দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। আমি এটুকু্ই জানি। এর চেয়ে বেশি জানি না।

এরপর ডিআইজি প্রিজন (ঢাকা বিভাগ) তৌহিদুল ইসলামকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন: খোঁজ নিয়ে বলতে হবে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন এই তোফায়েল আহমেদ জোসেফ। অভিজাত পরিবারের সন্তান জোসেফের বড় ভাই মেজর জেনারেল আজিজ আহমদ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সাবেক মহাপরিচালক। তাদের বাবা বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ওয়াদুদ আহমেদ। পাঁচ ভাইয়ের মাঝে সবার ছোট জোসেফ বড় ভাই হারিস আহমেদের হাত ধরে রাজনীতির মাঠে পদার্পণ করেন। হারিস আহমেদের নামও রয়েছে পুলিশের শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায়। হারিস এখন ইউরোপে বসবাস করেন। মাঝে মধ্যে ভারতে এলেও দেশে প্রবেশ করেন না।

নব্বইয়ের দশকে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন তাদের আরেক ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু। সেই হত্যাকাণ্ডের জন্য আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনকে দায়ী করা হয়।

এরশাদের শাসনামলে জোসেফের বড় ভাই হারিস আহমেদ নিজেকে মোহাম্মদপুর এলাকায় জাতীয় পার্টির নেতা হিসেবে পরিচয় দিতো। এরশাদ সরকারের পতনের পর, সে নিজের পরিচয় দিতে শুরু করে মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের নেতা হিসেবে। ঢাকার ৪৪ নম্বর কাউন্সিলরও হয়েছিলো সে। এ ওয়ার্ড থেকে কমিশনার পদে নির্বাচনও করেছিলো সে। জোসেফ তার বড় ভাইয়ের ক্যাডার বাহিনীর প্রধানের দায়িত্বপালন করতো এবং এক সময় নিজেকে ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানার নেতা হিসেবে দাবি করতো। তবে সংগঠনের কোনো পদে সে ছিলো না বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

এরপর থেকে মোহাম্মদপুর-হাজারীবাগসহ আশপাশের এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন জোসেফ। যোগ দেন সুব্রত বাইনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আলোচিত সেভেন স্টার গ্রুপে। পুরো রাজধানী তখন সেভেন স্টার গ্রুপ ও ফাইভ স্টার গ্রুপ নামে দু’টি বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করতো। এভাবেই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকায় নাম উঠে আসে জোসেফের। সূত্র: আমাদের সময় ও যুগান্তর।

About superadmin

Check Also

শিশু জয়নব আনসারীর খুনি ইমরান আলীকে চারবার মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ

বিশ্বালোচিত পাকিস্তানের লাহোরে ৬ বছরের শিশু জয়নব আনসারীকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ইমরান আলীকে ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *